শারীরিক সমস্যা ডেকে আনছে স্মার্টফোন

খেতে খেতে ফোন, হাঁটতে হাঁটতে কানে গান, শুয়ে শুয়ে চোখের সামনে সিনেমা… ইন্দ্রিয় বুঁদ হয়ে আছে মুঠোফোনের মায়ায়। অতিরিক্ত মোবাইলের ব্যবহার কি অজান্তেই অসুখ ডেকে আনছে? তার জন্য আগে ভাল করে জানতে হবে মোবাইলের খুঁটিনাটি।

মোবাইল কী ভাবে কাজ করে?

সাধারণত কল করা, মেসেজ পাঠানো, ছবি শেয়ার করার মতো কাজই ফোনে প্রতিদিন করা হয়ে থাকে। এই কাজগুলি করার সময়ে রেডিয়োওয়েভ এবং মাইক্রোওয়েভ নির্গত ও গ্রহণ করে মোবাইল। এই ওয়েভের রেঞ্জ প্রায় ৮০০ থেকে ২৬০০ মেগাহার্টজ়। অবশ্য দেশ ও ফোনের নেটওয়ার্কের উপরে নির্ভর করে এই মাত্রার ওঠানামা। এই মাইক্রোওয়েভ থেকেই কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত। আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মি থেকে আমাদের শরীরে ক্ষতি বেশি হয়। মনে রাখতে হবে, ওয়েভ যত মাইক্রো বা সূক্ষ্ম হবে, তার প্রভাব পড়বে বেশি। মাইক্রোওয়েভ নির্দিষ্ট জায়গা আক্রমণ করতে সক্ষম হয়। সমস্যার সূত্রপাত সেখানেই।

সমস্যা কোথায়?

সারাক্ষণ ফোনে কথা বললে ক্যানসার হয়? ফোনে সিনেমা দেখলে চোখ নষ্ট হয়ে যায়? এমন অনেক প্রশ্ন উঠছে বটে! তবে তা প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে। এখনও তা প্রমাণিত হয়নি। তবে মোবাইল ফোনের মাইক্রোওয়েভ দিয়ে মস্তিষ্কে আঘাত হানা যায়। এই ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করা যায় ‘ফ্রে এফেক্ট’ দিয়ে। ধরুন, অনেকক্ষণ ধরে একটা ভনভন বা বিনবিনে যান্ত্রিক আওয়াজ যদি শোনেন, দেখবেন মাথা ধরে যাবে। ফোনের মাধ্যমে যে আওয়াজটা আপনার কানে এসে পৌঁছচ্ছে, একটু দূর থেকে ফোন ধরলে দেখবেন, শব্দটি তেমনই শোনাবে। গত শতাব্দীর শেষ দিকে আমেরিকান বিজ্ঞানী অ্যালান ফ্রে লক্ষ করেন, দূর থেকে মাইক্রোওয়েভের সাহায্যে মানুষের মস্তিষ্কে আঘাত হানা যায়। মোবাইলে আমরা যা শুনি, তা শব্দ। সেটি মাইক্রোওয়েভের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছায়।

মেডিসিনের চিকিৎসক জানিয়েছেন, মোবাইল থেকে যে রেডিয়েশন হয়, তা কিছুটা হলেও শরীরের ক্ষতি করছে। অনেকক্ষণ ফোনে কথা বলার পরে দেখবেন, ফোন ও কান দুই-ই গরম হয়ে ওঠে। সাধারণত শরীর থেকে কিছুটা দূরে মোবাইল রাখলেই ভাল। রাস্তায় যাতায়াতের সময়ে হাতে না নিয়ে একটা ব্যাগে মোবাইল নিন। চার্জ দেওয়ার সময়েও মোবাইলে কথা বলা ঠিক নয়। কারণ সে সময়ে মোবাইলের চার পাশে একটা ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি হয়। তাই চার্জ অফ করে কথা বলুন। এখন অনেকের কাজই মোবাইল-কেন্দ্রিক। সে ক্ষেত্রে ফোনের পরিবর্তে ব্লু-টুথে কথা বলা যায়। অনেক বাইক আরোহী যাতায়াতের সময়ে হেলমেটের মধ্যে মোবাইল ঢুকিয়ে কথা বলতে বলতে যান। তারা কিন্তু অনায়াসেই ব্লু-টুথ হেডফোন ব্যবহার করতে পারেন।

নার্ভের সমস্যা: অনেকে বাঁ হাতে, অনেকে আবার ডান হাত দিয়েই মোবাইল ঘাঁটতে অভ্যস্ত। সারাক্ষণ মোবাইল স্ক্রল করতে গিয়ে হাতের কয়েকটি বিশেষ আঙুলের উপরে চাপ পড়ে। আবার ফোন ধরার জন্য কনুই ভাঁজ করে রাখায় ‘সেল ফোন এলবো’র শিকারও হতে পারেন। এতে হাতের কনিষ্ঠা ও অনামিকা অসাড় হয়ে যায়। ফোরআর্মেও ব্যথা হতে পারে। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাও বাড়তে থাকে।

চোখের সমস্যা: মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকায় চোখের সমস্যাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আড্ডা মারা থেকে শুরু করে, মোবাইলে টানা সিনেমা দেখা রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটানা স্ক্রিন দেখার ফলে ড্রাই আইজ়ের সমস্যা বাড়ছে। চোখে পাওয়ার বাড়ার সমস্যাও বিরল নয়।

অনিদ্রা: ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত চোখের সামনে ফোন ধরে থাকলে ঘুমের বারোটা বাজবে। এতে মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে যায়। ফলে নিদ্রাহীনতার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

এ তো গেল অসুখ-বিসুখের কথা। চরিত্রগঠনেও মোবাইলের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। ছোট থেকেই বাচ্চার হাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য ফোন তুলে দিলে একে তো সে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে, তার উপরে তার চরিত্র গঠনেও বাধা সৃষ্টি হবে। সকলের সঙ্গে মিশতে শিখবে না। মা-বাবার কথা না শুনে বায়না করতে পারে। ছোট থেকেই মোবাইল দেখতে থাকলে বয়ঃসন্ধিতে সে অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে। মোবাইলের জগতে অনেক কিছুরই ফাঁদ পাতা। আপনি যেই মুহূর্তে ফোনের ডেটা অন করে সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে কিন্তু বাচ্চার উপরে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। আপনি একটা কার্টুন খুলে সন্তানের হাতে ধরিয়ে দিলেও সে স্ক্রল করে অন্য দিকে চলে যেতে পারে। সুতরাং সন্তানের কম বয়স থেকেই মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে।

সতর্ক থাকুন

• টানা ফোনের দিকে না তাকিয়ে চারপাশে তাকানোর অভ্যেস রাখুন।

• যদি টানা অনেকক্ষণ কথা বলতে হয়, তা হলে ব্লুটুথে বা হেডফোনে নিয়ন্ত্রিত ভলিউমে কথা বলাই শ্রেয়।

• মাথার কাছে ফোন নিয়ে শোবেন না। ঘরের বাইরে ফোন রেখে দিন।

• বাচ্চাদের চুপ করে বসিয়ে রাখার জন্য ফোনের দ্বারস্থ না হওয়াই ভাল। বরং নিজেও সন্তানের সঙ্গে খেলা করুন। এতে ওরও সময় কেটে যাবে। আর আপনারও ভাল লাগবে।

দৈনন্দিন জীবনে ছোট বদল আপনার জীবন অনেকটাই পাল্টে দিতে পারে। মোবাইল জীবনের একটা অংশ হয়ে উঠেছে ঠিকই। কিন্তু খেয়াল রাখবেন, সেটাই যেন জীবন না হয়ে যায়।

প্রযুক্তির পথ ও জয়গানের সব খবর তুলে এনে জীবন সহজ করছে ITSohor। দেশ ও বিদেশের প্রযুক্তির সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে জানতে ভিজিট করুনঃ আইটি শহরে

আপনার মতামত, লাইক ও কমেন্টের সঙ্গে থাকুন আমাদের আইটি শহরের ফেসবুক ফ্যান পেজে

49 Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com